আমার বাংলা এক সময় ছিল ভীষন উর্বর ভূমি। অনেকে গর্ব করে বলতো আমার আছে সোনার মাটি। এই মাটি দুর্জয় খাঁটি। এই মাটিতে যা ফলানো যায় তাই হয় সোনা। কথাটি রূপক হলেও সত্য। কিন্তু আজ বিভিন্ন কারনে এই মাটি দূষিত হচ্ছে। আমাদের অজ্ঞতাও অনেকাংশে দায়ী বলে মনে করছি। রাসায়নিক সারের অসম ও অপরিকল্পিত ব্যবহারেও এই দূষণ হচ্ছে। পাশাপাশি কীটনাশকের যথেচ্ছা ব্যবহার। আমরা এই দুর্ভোগ থেকে রেহাই পেতে শস্য পর্যায়ের মতো পরিকল্পনা করে এগিয়ে নিতে পারি আমাদের ফসল উৎপাদন।
শস্য পর্যায় হলো একটি নির্দিষ্ট সময়ে একটি নির্দিষ্ট জমিতে বিভিন্ন ধরণের শস্য ধারাবাহিকভাবে চাষ করানো। যে কোন জমিতে বছরের পর বছর একই শস্য না ফলিয়ে দুই তিন বছর অন্তর মেয়াদি ফসল ফলানো উচিত। এতে করে জমির উর্বরতা অনেকাংশে রক্ষা পায়। এতে ফসলের অনেক উপকার হয়। বীজ হয় স্বাস্থ্যবান। একই সাথে জমিতে অজৈব ও জৈব সার পরিমানমত পর্যায়ক্রমে ব্যবহারে জমির উর্বরতা বৃদ্ধি পায়। শস্য পর্য়ায়ের নিয়ম অনুসারে সীম জাতীয় বা সবুজ সার জাতীয় ফসলের চাষ করা অবশ্যই প্রয়োজন। এই জাতীয় গাছ জমিতে বা মাটিতে পচে গিযে জৈব উপাদান বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। সীম জাতীয় ফসল বিশেষ করে বিভিন্ন ধরনের ডাল-ছোলা, মটর, মুগ, বরবটি এবং সয়াবীন, চীনাবাদাম, ধৈঞ্চা প্রভৃতি চাষ করে জমিতে জৈব পদার্থের সাথে সাথে নাইট্রোজেন জাতীয় উপাদানের পরিমাণ বৃদ্ধি করে, পাশাপাশি জমির ক্ষয়রোধও করে। খাদ্যের কথা মাথায় রেখে আমরা যারা কৃষক শুধুমাত্র জমিতে বছর বছর ধান উৎপাদনের দিকে ঝুঁকে পরছি। ধান হচ্ছে খাট শিকড় যুক্ত ফসল। ফলে বছর বছর ধান উৎপাদনের ফলে জমির উপর স্তরের খাদ্য বা উপাদান শেষ হয়ে যায়। এতে অন্য স্তরের খাদ্য উপাদান অব্যবহৃত থাকে। ফলে জমির উর্বরতায় বৈষম্যের সৃষ্টি হয়। এটি জমিতে ফসল উৎপাদনের অন্যতম একটি অন্তরায়। এই সময়ে কৃষক যদি একটু বুদ্ধি করে ধানের পরে পাট বা সময় অনুসারে অন্য কোন ফসল ফলায় তাহলে ধানের পোকা বা রোগজীবাণু পাটের গাছ বা অন্য গাছকে আর আক্রমণ করতে পারবে না। এতে ঐ পোকা বা জীবাণু খাদ্যের অভাবে মারা যাবে। ফলে পোকা বা জীবাণুর উপদ্রব কমে যাবে। অন্যদিকে রাসায়নিক সার বা কীটনাশকের অতি ব্যবহারে জমির উর্বরতা শক্তি হ্রাস পাচ্ছে প্রতিনিয়ত। তাই আমাদের উচিত শস্য পর্যায় অবলম্বন করে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি অর্থনৈতিক ভাবে নিজেকে ও দেশকে বাঁচানো।
উচ্চ ফলনশীল শস্য উৎপাদনের প্রধান শর্ত হলো জমিতে প্রচুর পরিমানে পুষ্টি উপাদান থাকতে হবে। জমির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধিতে শস্য পর্যায়ই হতে পারে কৃষকের একমাত্র হাতিয়ার। ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠির খাদ্য চাহিদা পূরণে শস্য পর্যায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমার বিশ্বাস। আমরাই পারি আমার সোনার বংলার সোনার মাটিতে সোনা ফলাতে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন